পাটান (Patan) – শিল্প ও স্থাপত্যের ঐতিহ্যবাহী শহর | নেপাল ভ্রমণ গাইড
পাটান (Patan) – শিল্প ও স্থাপত্যের ঐতিহ্যবাহী শহর
নেপাল ভ্রমণ সিরিজ,কাঠমান্ডু উপত্যকার শৈল্পিক হৃদয়
কাঠমান্ডু থেকে বাগমতী নদী পেরোলেই যে শহরটা দাঁড়িয়ে আছে কয়েকশো বছরের কারুকাজ নিয়ে, তার নাম পাটান। স্থানীয়ভাবে একে ডাকা হয় ললিতপুরসংস্কৃত শব্দ, যার অর্থ "সৌন্দর্যের শহর"; পাটানের পুরনো এবং বর্তমান সরকারি নাম, আর এই নামটাই বোধহয় শহরটার সবচেয়ে নিখুঁত পরিচয়। প্রতিটা গলিতে কাঠের জানালা, প্রতিটা চত্বরে পাথরের মন্দির — পাটান অনেকটা জীবন্ত একটা জাদুঘরের মতো, যেখানে মানুষ এখনও বাস করে, রান্না করে, পূজা দেয়।
পাটানের পরিচয় ও ইতিহাস
পাটান কাঠমান্ডু উপত্যকার তিনটি প্রধান শহরের একটি — বাকি দুটো কাঠমান্ডু আর ভক্তপুর। মালিক্যুরাজাদের আমলে, বিশেষ করে মল্ল রাজবংশখ্রিস্টীয় ১২শ থেকে ১৮শ শতক পর্যন্ত কাঠমান্ডু উপত্যকা শাসনকারী রাজবংশ, যাদের আমলে নেওয়ারি শিল্প-স্থাপত্যের স্বর্ণযুগ এর সময়ে, পাটান হয়ে ওঠে নেপালের কারুশিল্প ও ধাতুশিল্পের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। আজও পাটানের কারিগরদের হাতে তৈরি মূর্তি আর গয়না সারা বিশ্বে পাঠানো হয়।
শহরের প্রাণকেন্দ্র হলো পাটান দরবার স্কয়ার, যেটি ১৯৭৯ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য স্থানUNESCO World Heritage Site হিসেবে কাঠমান্ডু উপত্যকার সাতটি স্মারক এলাকার একটি, ১৯৭৯ সালে তালিকাভুক্ত হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে কিছু কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, পরবর্তীতে নিখুঁতভাবে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।
পাটান দরবার স্কয়ার — শিল্পের জাদুঘর
দরবার স্কয়ারে ঢুকলেই চোখে পড়ে সারি সারি প্যাগোডা-শৈলীর মন্দির, কাঠের কারুকাজ করা জানালা, আর তামা-পিতলের মূর্তি। এখানে আছে কৃষ্ণ মন্দির১৬৩৭ সালে নির্মিত পাথরের তৈরি একুশটি চূড়াবিশিষ্ট মন্দির, যা শিখর-শৈলীতে নির্মিত নেপালের বিরল উদাহরণ, যেটা সম্পূর্ণ পাথর দিয়ে তৈরি এবং একুশটি চূড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে চারশো বছরেরও বেশি সময় ধরে।
এর পাশেই আছে পুরনো রাজপ্রাসাদ কমপ্লেক্স, যেখানে এখন রয়েছে পাটান জাদুঘরপুরনো রাজপ্রাসাদের অংশে স্থাপিত জাদুঘর, যেখানে বৌদ্ধ ও হিন্দু ধাতু-মূর্তির বিশাল সংগ্রহ আছে — যাকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা গোছানো জাদুঘর বলা হয়। ধাতুর তৈরি বুদ্ধমূর্তি, তারা দেবীর মূর্তি, পুরনো পাণ্ডুলিপি — সব মিলিয়ে এক বিকেল সহজেই কেটে যায়।
পাটান দরবার স্কয়ারের মূল আকর্ষণ
- কৃষ্ণ মন্দির — পাথরের শিখর-শৈলীর স্থাপত্য
- পাটান জাদুঘর — ধাতুশিল্পের বিশাল সংগ্রহ
- তলেজু মন্দির — রাজপরিবারের আরাধ্য দেবীর মন্দির
- বিশ্বনাথ মন্দির — শিবের মন্দির, হাতির মূর্তি দিয়ে সাজানো
- সুন্দরী চওক — রাজকীয় স্নানঘর ও পাথরের কুণ্ড
স্বর্ণ মন্দির (হিরণ্যবর্ণ মহাবিহার)
দরবার স্কয়ার থেকে কয়েক মিনিট হাঁটলেই পাওয়া যায় একটা অবিশ্বাস্য জায়গা — হিরণ্যবর্ণ মহাবিহারদ্বাদশ শতকে নির্মিত একটি বৌদ্ধ মঠ, যার পুরো বাইরের দেয়াল সোনার পাতে মোড়ানো বলে একে "স্বর্ণ মন্দির" বলা হয়, যাকে সবাই চেনে "স্বর্ণ মন্দির" নামে। তিনতলা এই প্যাগোডার বাইরের অংশ সোনার পাতে মোড়া, আর ভেতরে আছে শাক্যমুনি বুদ্ধের একটা সুন্দর মূর্তি। এখনও এখানে নিয়মিত পূজা হয়, স্থানীয় বৌদ্ধ পুরোহিতরা ধর্মীয় আচার পালন করেন। জুতো খুলে ভেতরে ঢুকতে হয়, আর ছবি তোলার আগে অনুমতি নেওয়া ভালো।
মহাবৌদ্ধ মন্দির — হাজার বুদ্ধের মন্দির
পাটানের আরেকটা চমক হলো মহাবৌদ্ধ মন্দির২০শ শতকের প্রথমদিকে নির্মিত, প্রায় নয় হাজার পোড়ামাটির ইটে বুদ্ধমূর্তি খোদাই করা একটি শিখর-শৈলীর মন্দির। সরু একটা গলি দিয়ে ঢুকতে হয়, আর হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ায় একটা টেরাকোটা টাওয়ার, যার প্রতিটা ইটে খোদাই করা আছে ছোট্ট একটা বুদ্ধমূর্তি। বার্মার বোধগয়া মন্দিরের আদলে তৈরি এই মন্দিরটা স্থানীয়ভাবে পরিচিত "হাজার বুদ্ধের মন্দির" নামে।
"পাটানের প্রতিটা উঠোনে একটা গল্প আছে, প্রতিটা কাঠের খুঁটিতে কয়েকশো বছরের ইতিহাস খোদাই করা।"
কুমারী বাহাল ও জাওয়ালাখেল
পাটানে আলাদা একজন কুমারী দেবী আছেন, কাঠমান্ডুর কুমারী থেকে আলাদা। কুমারী বাহালপাটানের নিজস্ব জীবন্ত কুমারী দেবীর বাসস্থান, যেখানে কাঠমান্ডুর থেকে আলাদা প্রথা মেনে কুমারী নির্বাচন করা হয় এ গেলে স্থানীয় নেওয়ারি সংস্কৃতির এই বিশেষ দিকটা সম্পর্কে জানা যায়। এখান থেকে একটু দূরে আছে জাওয়ালাখেল চত্বর, যেখানে স্থানীয় বাজার আর কাফে মিলিয়ে চমৎকার একটা সন্ধ্যা কাটানো যায়।
পাটানের কারুশিল্প ও শপিং
পাটান বিখ্যাত তার ধাতুশিল্পের জন্য। শহরের অলিগলিতে ছোট ছোট কারখানায় কারিগররা হাতে তৈরি করছেন থাংকা চিত্রতিব্বতি-নেপালি বৌদ্ধ ঐতিহ্যের কাপড়ের উপর আঁকা ধর্মীয় চিত্রকর্ম, যা সাধারণত মণ্ডল বা বুদ্ধমূর্তি বিষয়ক হয়, ব্রোঞ্জের মূর্তি, রূপার গয়না। যদি ঘরে সাজানোর জন্য কিছু কিনতে চান, পাটান দরবার স্কয়ারের আশেপাশের দোকানগুলো ঘুরে দেখুন — দরদাম করা এখানে স্বাভাবিক রীতি।
পাটান শিল্প কলেজ
ঐতিহ্যবাহী নেওয়ারি কাঠ ও পাথরের কারুশিল্প শেখানোর প্রতিষ্ঠান। ছাত্রদের কাজ দেখার সুযোগ থাকে।
পাটান ঢোকা গেট
পুরনো শহরে প্রবেশের ঐতিহাসিক ফটক, যেখান থেকে শুরু হয় হেরিটেজ ওয়াক।
কোথায় থাকবেন
| ধরন | এলাকা | আনুমানিক খরচ (প্রতি রাত) |
|---|---|---|
| বাজেট গেস্টহাউস | জাওয়ালাখেল | ৮০০–১৫০০ টাকা (নেপালি রুপি প্রায়) |
| মিড-রেঞ্জ হোটেল | পাটান দরবার স্কয়ারের কাছে | ২৫০০–৪৫০০ টাকা |
| বুটিক হেরিটেজ হোটেল | পুরনো শহরের ভেতরে | ৬০০০ টাকার উপরে |
যারা ঐতিহ্যের স্বাদ পেতে চান, তাদের জন্য পুরনো নেওয়ারি বাড়ি সংস্কার করে বানানো বুটিক হোটেলগুলো দারুণ অভিজ্ঞতা দেয় — কাঠের সিঁড়ি, পুরনো জানালা, সব মিলিয়ে অন্যরকম এক পরিবেশ।
খাবারদাবার
পাটানে নেওয়ারি খাবারের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ আছে প্রচুর। য়োমরিচালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি, তিল ও গুড়ের পুর ভরা একটি ঐতিহ্যবাহী নেওয়ারি মিষ্টি পিঠা, চটপটে আলু-দম, আর মোমো তো অবশ্যই চেখে দেখা উচিত। জাওয়ালাখেল এলাকায় বেশ কিছু ভালো রেস্তোরাঁ আছে, যেখানে নেওয়ারি থালি পাওয়া যায় — একসাথে অনেকগুলো পদ পরিবেশন করা হয়, যা একবারেই পুরো নেপালি সংস্কৃতির স্বাদ দেয়।
কীভাবে যাবেন
কাঠমান্ডু থেকে পাটান মাত্র ৫–৬ কিলোমিটার দূরে, ট্যাক্সি বা স্থানীয় বাসে ২০–৩০ মিনিটেই পৌঁছানো যায়। বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ফ্লাইটে কাঠমান্ডু পৌঁছে এরপর পাটান যাওয়াই সবচেয়ে সহজ পথ।
নেপাল সিরিজের অন্যান্য পর্ব
আরও তথ্যের জন্য
প্রায়জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
বিদেশি পর্যটকদের জন্য প্রবেশ ফি নেওয়া হয়, যা সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়। সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য সাধারণত কম ফি নির্ধারিত থাকে। সঠিক হালনাগাদ তথ্যের জন্য প্রবেশপথে খোঁজ নেওয়াই ভালো।
দরবার স্কয়ার আর আশেপাশের মূল মন্দিরগুলো ঘুরতে আধাবেলাই যথেষ্ট। তবে জাদুঘর, কারুশিল্পের দোকান আর পুরনো গলি ঘুরতে চাইলে পুরো একদিন রাখা ভালো।
পাটান প্রশাসনিকভাবে আলাদা একটি শহর, যা ললিতপুর জেলায় অবস্থিত। তবে এটি কাঠমান্ডু উপত্যকার অংশ এবং বাগমতী নদী দিয়ে কাঠমান্ডু শহর থেকে বিভক্ত।
অক্টোবর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত আবহাওয়া শুষ্ক ও আরামদায়ক থাকে, যা ঘোরাঘুরির জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। বর্ষাকালে (জুন-আগস্ট) রাস্তাঘাট পিচ্ছিল হতে পারে।
সাধারণ ফটোগ্রাফির জন্য আলাদা অনুমতি লাগে না, তবে কিছু মন্দিরের ভেতরে বা জাদুঘরে আলাদা ক্যামেরা ফি থাকতে পারে। স্বর্ণ মন্দিরের মতো সক্রিয় উপাসনালয়ে ছবি তোলার আগে স্থানীয়দের কাছে অনুমতি চাওয়া শিষ্টাচার।
হ্যাঁ, পাটানের বেশিরভাগ রেস্তোরাঁয় নিরামিষ নেওয়ারি ও নেপালি খাবার সহজে পাওয়া যায়। দাল-ভাত-তরকারি এখানকার সবচেয়ে সাধারণ ও সহজলভ্য নিরামিষ খাবার।
পাটান থেকে ভক্তপুরের দূরত্ব প্রায় ১২–১৪ কিলোমিটার, যা গাড়িতে এক ঘণ্টার মতো সময় নেয়। একই দিনে দুই শহর ঘোরা সম্ভব হলেও তাড়াহুড়ো এড়াতে আলাদা দিন রাখাই ভালো।
দরবার স্কয়ারের আশেপাশের গলি এবং মঙ্গল বাজার এলাকা ধাতব মূর্তি, থাংকা চিত্র ও হস্তশিল্পের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয়।
পাটানের রাস্তাগুলো মূলত হাঁটাপথ ও সমতল, ফলে পরিবার নিয়ে ঘোরাঘুরি বেশ সহজ। তবে কিছু পুরনো রাস্তায় পাথরের গাঁথুনি অসমান হতে পারে, তাই আরামদায়ক জুতা পরা উচিত।
কাঠমান্ডু থেকে কাছে হওয়ায় দিনে ফিরে আসা সম্ভব। তবে সন্ধ্যার পাটান, বিশেষ করে আলো জ্বলা মন্দির চত্বর, একরাত থাকলে অন্যরকম অভিজ্ঞতা দেয়।
_%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA_%E0%A6%93_%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A5%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A7%87%E0%A6%B0_%E0%A6%90%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%B9%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B9%E0%A7%80_%E0%A6%B6%E0%A6%B9%E0%A6%B0.jpeg)

কোন মন্তব্য নেই